ইট পাটকেল পর্ব ৮ - ইট পাটকেল সকল পর্বের লিংক

কালকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটা লাইভ কনসার্ট আছে নূরের।সারাদিন অফিস সামলে গান নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় পায় না নূর।তবে যতই বিজি থাক না কেন গান সে ছাড়বে না।
ইট পাটকেল পর্ব ৮ - ইট পাটকেল গল্পের লিংক
মন খারাপের সময় গুলোতে এই গান ই ছিল একাকিত্ব ঘুচানোর একমাত্র সঙ্গি।তাই বাবার দেয়া দায়িত্ব সামলে ও নিজের ক্যারিয়ারে মন দিবে।

আরো পড়ুন : ইট পাটকেল পর্ব ১
ইট পাটকেল পর্ব ২
ইট পাটকেল পর্ব ৩
ইট পাটকেল পর্ব ৪
ইট পাটকেল পর্ব ৫
ইট পাটকেল পর্ব ৬
ইট পাটকেল পর্ব ৭
ইট পাটকেল পর্ব ৮
ইট পাটকেল পর্ব ৯
ইট পাটকেল পর্ব ১০
ইট পাটকেল পর্ব ১১
ইট পাটকেল পর্ব ১২
ইট পাটকেল পর্ব ১৩
ইট পাটকেল পর্ব ১৪
ইট পাটকেল পর্ব ১৫
ইট পাটকেল পর্ব ১৬
ইট পাটকেল পর্ব ১৭
ইট পাটকেল পর্ব ১৮
ইট পাটকেল পর্ব ১৯
ইট পাটকেল পর্ব ২০
ইট পাটকেল পর্ব ২১
ইট পাটকেল পর্ব ২২
ইট পাটকেল পর্ব ২৩
ইট পাটকেল শেষপর্ব ২৪

অফিসের সমস্ত কিছু অনেকটা গুছিয়ে এনেছে নূর।আশমিন এখন পুরো পুরি রাজনীতি নিয়ে ব্যাস্ত। দায়িত্ব থেকে রেহাই পাওয়ার পর থেকে সে আর এদিকে মারায় নি।নূর ইদানীং চোখে চোখে রাখছে আশমিন কে। অফিসের রেসপনসেবলিটি থেকে মুক্ত হওয়ার পর সে যেন একটু বেশিই বেয়াড়া হয়ে উঠছে। সকাল থেকে অমির কোন পাত্তা নেই।ছেলেটা হুট করেই নিখোঁজ হয়ে গেছে। মোবাইল ও বন্ধ। এক আআঙ্গুলের সাহায্যে কপালের মাঝখানে হালকা ম্যাসাজ করে দেয়ালে ঝুলানো ঘড়ির দিকে তাকালো নূর।ঘড়ির কাটা বারোটার ঘর পেরিয়ে গেছে অনেক আগে। চেয়ার থেকে উঠে গ্লাসের দেয়ালের সামনে গিয়ে দাড়ালো নূর। কপালে চিন্তার ভাজ পড়েছে কয়েকটা। আজ সকাল থেকে অমি আশমিনের উপর নজর রাখছিল।আশমিন কিছু করে নি তো!চিন্তা টা মাথায় আসতেই নূর কয়েকবার মাথা ঝাকালো। আশমিন অমির কিছু করবে না তা সে খুব ভালো করেই জানে। মোবাইলের রিংটোনে ভাবনা থেকে বেরিয়ে এলো নূর। দ্রুত পায়ে গিয়ে কল রিসিভ করলো।

— হ্যালো ম্যাম।আমি অমি বলছি।

— অমি!কোথায় তুমি? মোবাইল বন্ধ কেন তোমার? আর এটা কার নাম্বার?(চিন্তিত গলায়)

অমি নূরের একসাথে করা এতগুলো প্রশ্ন শুনে ভেবাচেকা খেয়ে গেলো।

— আমার ফোন টা বন্ধ হয়ে গেছে ম্যাম।

— তুমি ঠিক আছো?

— জ্বি ম্যাম।

— কোন নিউজ পেলে?

— স্যারের সাথে ওইদিন হোটেলে যে মেয়েটার ছবি ছিল সেই মেয়ের খোঁজ পেয়েছি ম্যাম।মেয়েটি ওই হোটেলের বার সিঙ্গার।ইয়ে মানে আসলে ম্যাম।

অমি কিছু একটা বলতে গিয়ে বার বার আটকে যাচ্ছে। কথা টা বলা ঠিক হবে কি না বুঝতে পারছে না।

— যা বলার সরাসরি বলো অমি।(শান্ত গলায়)

— আসলে ম্যাম,ওইদিন মেয়েটা স্যারের,সাথেই ছিল।

নূর চোখ বন্ধ করে কয়েক বার শুকনো ঢোক গিললো।অমি নিজেও চুপ করে আছে। নূর কে সময় দিচ্ছে নিজেকে সামলে নেয়ার জন্য। নূর কয়েকবার জোরে শ্বাস নিয়ে শান্ত অথচ ভয়ংকর গলায় বলল,

— ওটা যেখানেই থাকুক না কেন তুলে নিয়ে এসো অমি।

— ওকে ম্যাম।

অমি ফোন রাখতেই চেয়ারে গা এলিয়ে দিল নূর।আশমিন কে নিয়ে কিছু ভাবতে ইচ্ছে করছে না। সামনে অনেক ভয়*ংকর সত্যি অপেক্ষা করছে। এখন ভেঙে পড়া চলবে না।

সানভি অসহায় চোখে তাকিয়ে আছে আশমিনের দিকে। আশমিনের অবশ্য সেদিকে কোন খেয়াল নেই। সে নিজ মন ল্যাপটপে কিছু একটা করছে।

— মেয়েটাকে এখনো বাচিয়ে রেখেছো কেন সান?

আশমিনের হিমশীতল গলা শুনে কেপে উঠলো সানভি।কয়েক দফা ঢোক গিলে চিন্তা করলো, মেয়েটা কে মা*রার কথা কবে বললো!

— গরিবের ঘরের মেয়ে স্যার। অন্ধ বাবার মেই মেয়ে ছাড়া আর কেউ নেই।

আশমিন চেয়ারে হেলান দিয়ে শান্ত চোখে তাকালো সানভির দিকে। কয়েক পলক তাকিয়ে থেকে গম্ভীর গলায় বলল,

— আমি আছি সান।

সানভি আর কিছু বললো না। আশমিন বাকা হেসে বললো,

— চিন্তা করো না সান।আমার ইচ্ছাকৃত ফেলে রাখা কাজ গুলো তোমার ম্যাম করে দিবে।

সানভি মাথা নেড়ে চলে গেলো। সানভি বের হতেই আমজাদ চৌধুরী হন্তদন্ত হয়ে আশমিনের কেবিনে ঢুকলো। বাবার এমন অস্থির ফেস দেখে মুচকি হাসলো আশমিন। আমজাদ চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে বাকা হেসে বললো,

— রাস্তায় ইভটিজিং করে পালিয়ে এসেছো নাকি।এভাবে দৌড়াচ্ছো কেন,?

আমজাদ চৌধুরী চটে গেলেন।দাত কিড়মিড় করে বললো,

— বাবা হই তোমার। বাবা কে ইফটিজার বলতে লজ্জা করে না তোমার?

— লজ্জা কেন করবে? কাল থেকে তুমি গার্লস হোস্টেলের সামনে দাড়িয়ে থাকবে।এক সপ্তাহের মধ্যে বিয়ে তোমার।ওখানে দাঁড়িয়ে মেয়ে পছন্দ করবে।যাকে পছন্দ করবে সেই আমার মা হবে।

আমজাদ চৌধুরীর বিস্ময়ের মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে এই ছেলে।এখন নাকি তাকে বখাটে ছেলেদের মতো গার্লস হোস্টেলের সামনে দাড়িয়ে মেয়ে খুজতে হবে। আমজাদ চৌধুরী আর কথা বারালেন না।এই অসভ্য ছেলে যখন তখন ইজ্জতের দফারফা করে দিতে পারে।

— আমার কিছু টাকা লাগবে আশমিন।

— আমি জানি আব্বু।চিন্তা করো না। তোমার বিয়ে আমি স্পনসর করবো।আমার একমাত্র বাবার বিয়ে বলে কথা।তুমি বরং পার্লারে গিয়ে হালকা একটা ফেসিয়াল করিয়ে এসো।

আমজাদ চৌধুরী বুঝলেন ছেলে তার কথা শুনবেন না।বাধ্য হয়েই চলে গেলেন।বাসায় কামিনী হা হুতাশ করে কাদছে।এক মাসের মধ্যে টাকা দিতে না পারলে তাকে জেলে যেতে হবে। বার বার নূর কে অভিশাপ দিয়ে যাচ্ছে। এদিকে ছেলে উঠে পরে লেগেছে তাকে বিয়ে করানোর জন্য। কামিনী যাই করুক না কেন সে তো কামিনী কে ভালোবাসে। কামিনীর জায়গা অন্য কাউকে সে কোন দিন ও দিতে পারবে না।এতে কামিনী একা কামিনী একা যন্ত্রণা ভোগ করবে না। তার সমান ভাগিদার সে নিজেও হবে।আশমিন বুঝে শুনেই এসব করছে।সে কষ্ট পাবে জেনেও তাকে আবার বিয়ে করানোর জন্য উঠে পরে লেগেছে। না জানি কোন ভুলের শাস্তি দিচ্ছে ছেলে তাকে।

আশমিন শান্ত চোখে তাকিয়ে রইলো তার বাবার যাওয়ার দিকে।দীর্ঘশ্বাস ফেলে মনে মনে বললো,

— তুমি ভুল করেছো বাবা।কাছের মানুষ কে না চেনার ভুল যখন করেছো শাস্তি তো তোমাকে পেতেই হবে।

নূরের টর্চা*র রুমে একটা মেয়েকে বেধে রাখা হয়েছে।নূর মেয়েটার সামনে একটা চেয়ারে আয়েশ করে বসে আছে।থেমে থেমে গুন গুন করে কিছু একটা গাইছে।মেয়েটার জ্ঞান ফিরতে না দেখে এবার বিরক্ত চোখে তাকালো নূর।অমির দিকে তাকিয়ে বিরক্ত কন্ঠে বললো,

— এর জ্ঞান ফেরাও অমি।

অমি বালতি ভর্তি পানি নিয়েই দাঁড়িয়ে ছিল।নূরের হুকুম পেতেই এক বালতি পানি ছুড়ে মারলো মেয়েটার মুখে। কয়েক সেকেন্ডে পিটপিট করে চোখ মেললো সে।নূর পা নাচিয়ে শরীর দুলিয়ে মেয়েটিকে পরখ করছে।

— আমাকে এখানে কেন আনা হয়েছে??

মেয়েটার কর্কশ গলা শুনে বাকা হাসলো নূর। চোখ বন্ধ করে আরাম করে বসলো।

— অমি।

— ইয়েস ম্যাম।

— ওর মুখটা ভে*ঙ্গে দাও।বিশেষ করে বা পাশ টা।



অমি ইশারা করতেই একটা পালোয়ান সাইজের মেয়ে এসে মেয়েটার মুখে পরপর কয়েক বার আঘাত করলো। মুখের বা পাশ টা থেতলে যেতেই অমি থামিয়ে দিল। মেয়েটা চিৎকার করে আর্তনাদ করছে।নূর নিজের চেয়ার থেকে উঠে মেয়েটার সামনে গিয়ে হালকা ঝুকলো। পাচ আঙ্গুলের সাহায্যে থুতনি উচু করলো।নূরের চোখ মুখ ভয়ংকর লাল হয়ে আছে। নূর মেয়েটার গাল চেপে ধরে দাতে দাত চেপে বললো,,

— আমার ব্যবহার করা জুতো গুলোর ও কারখানা তে একজোড়া বানানো হয় যাতে অন্য কেউ এই মডেল ইউজ করতে না পারে।আর তুই সেই আমার নামে দলিল করা একমাত্র বরের বুকে মাথা রেখে ঘুমাস।সাহস আছে মাইরি। তোর এই শরীর আমি আস্ত রাখবো ভাবলি কি করে।

মেয়েটা এতক্ষণ যন্ত্রণায় আর্তনাদ করছিল। এবার নূরের দিকে তাকিয়ে ক্রুর হাসলো। ব্যঙ্গাত্মক গলায় বলল,

— তাহলে তো আপনার সেই দলিল করা একমাত্র বরের বুকটাও ধ্বংস করতে হয়।সে নিজেও তো অন্য একটা মেয়ে দ্বারা ইউজড হয়ে গেছে।

মেয়েটার কথা শেষ হতেই তার কপাল বরাবর একটা গু*লি এফোড় ওফোড় করে দিলো।

আশমিন ব*ন্দুকের নলের উপর ফু দিয়ে বাকা হাসলো।


কথা হবে, দেখা হবে
প্রেমে প্রেমে মেলা হবে
কাছে আসা-আসি আর হবে না
চোখে চোখে কথা হবে
ঠোঁটে ঠোঁটে নাড়া দেবে
ভালবাসা-বাসি আর হবে না
শত রাত জাগা হবে
থালে ভাত জমা রবে
খাওয়া-দাওয়া কিছু মজা হবে না
হুট করে ফিরে এসে
লুট করে নিয়ে যাবে
এই মন ভেঙে যাবে, জানো না
আমার এই বাজে স্বভাব
কোনোদিন যাবে না
আমার এই বাজে স্বভাব
কোনোদিন যাবে না

আশমিনের গান শুনে চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো নূরের। রাগে হাত মুঠ করে ফেললো। দাতে দাত চেপে চোখ বন্ধ করে নিজের হাতের পিস্ত*লটা শক্ত করে ধরলো।রাগে মাথা দপদপ করলে ও ফেস সম্পুর্ন স্বাভাবিক করে ফেললো। অমি সহ বাকি সবাই অসহায় চোখে তাকিয়ে আছে দুজনের দিকে।নূর পিছনে ঘুরতেই দেখলো আশমিন তার থেকে ঠিক তিন হাত দূরে।তার দিকেই এগিয়ে আসছে সে।

একটা গু*লি আশমিনের বুকের বাপাশ ভেদ করতেই থেমে গেলো আশমিন।অবাক চোখে তাকালো নূরের দিকে। সবাই স্তব্ধ হয়ে নূরের দিকে তাকিয়ে আছে। অথচ নূর সম্পুর্ন শান্ত।এখনো হাতের পি*স্তল আশমিনের দিকে তাক করা।আশমিনের সাদা শুভ্র পাঞ্জাবি মুহুর্তেই রক্তিম বর্ণ ধারণ করেছে। বুকের দিকে একবার তাকিয়ে আবার নূরের দিকে তাকালো আশমিন।রক্তিম চোখ দুটো ছলছল করলেও মুখে তার মুচকি হাসি।নূর এগিয়ে গেলো আশমিনর দিকে।আশমিন হাটু মুরে বসে পরেছে ততক্ষণে। সবাই যেন একটা ঘোরের মধ্যে আছে। নূর আশমিনের সামনে বসে তার গালে হাত রাখলো। কপালে চুমু খেয়ে কানের কাছে ফিসফিস করে গাইলো,

আশমিন কে হসপিটালে সিফট করা হয়েছে।খুব গোপনে ট্রিটমেন্ট করা হচ্ছে আশমিনের। অমি এখনো নিজের ঘোর থেকে বেরিয়ে আসতে পারে নি। নূর এমন কিছু করবে তা স্বপ্নে ও ভাবতে পারেনি সে।সানভি চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে বারান্দায়। শূন্য দৃষ্টিতে অপারেশন থিয়েটারের দিকে তাকিয়ে আছে। আমজাদ চৌধুরী কেউ জানায়নি। বিষয় টা কোন ভাবেই মিডিয়ায় ফাস হতে দেয়া যাবে না। চারিদিকে শত্রুর অভাব নেই। আশমিনের অসুস্থতা তাদের একটা নতুন সুযোগ করে দেয়া হামলা করার জন্য।

— আমার বিশ্বাস হচ্ছে না ম্যাম এমন কিছু করতে পারে।

সানভি চোখ ঘুরিয়ে অমির দিকে তাকালো। অমি অপরাধীদের মতো মাথা নিচু করে বারান্দার চেয়ারে বসে আছে। সানভি দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।

— সময় মানুষ কে বদলে দেয় অমি।রাফসান শিকদারের মেয়ে সে।হিংস্রতা তার রক্তে মিশে আছে। সে যেমন মায়া দেখাতে জানে তেমন হিংস্র বাঘের ন্যায় খুব*লে খেতে ও জানে।অবিশ্বাস করার কিছু নেই।

পরিস্থিতি অনেক বিগড়ে যাচ্ছে সানভি।সব কিছু হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। তোমার মনে হয় স্যার ম্যাম কে ছেড়ে দিবে? পাল্টা আঘাত সে ও করবে।এরকম চলতে থাকলে তাদের একজনের হাতে আরেকজনের বিনাশ নিশ্চিত।

— সব কিছু সামনে আসলে ম্যাম নিজেকে সামলাতে পারবে না অমি।সত্যি মাঝে মাঝে খুব নিষ্ঠুর হয়।ম্যাম যেই সত্যির তালাশ করছে তা জানলে সে নিজেই ভেঙ্গে গুড়িয়ে যাবে। কিছু কিছু সত্যি গোপন থাকাই সবার জন্য মঙ্গল।

অমি নির্মিশেষে তাকিয়ে রইলো সানভির দিকে।তার নিজের সত্যিটাই তো নূর কে ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেয়ার জন্য যথেষ্ট। বয়সে সে নূর থেকে তিন বছরের বড়।ছোট বেলা থেকেই আমজাদ চৌধুরীর অনাথ আশ্রমে বড় হয়েছে। নূর কে প্রথম প্রথম সে খুব একটা পছন্দ করতো না। কিন্তু ছোট্ট নূর যখন আশ্রমে আসতো তখন সে তার থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখতে পারতো না। ধিরে ধিরে নূরের মায়ায় নিজেকে জরিয়েই নিল।নূর যখন দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছিল তখন সে ও নূরের সাথেই ছিল।একা ছাড়ে নি নূর কে। চোখ বন্ধ করে চেয়ারে গা এলিয়ে দিলো অমি।সত্যি যেন কখনো নূরের সামনে না আসে সেই দোয়াই করতে লাগলো।

রাফসান শিকদার কে ব্যবসার কাজে মাঝে মধ্যে অনেক দেশেই ঘুরতে হতো। নূরের মা আর রাফসান শিকদারের ভালোবাসার বিয়ে ছিল।অসম্ভব ভালবাসতো সে নূরের মাকে।সুদর্শন রাফসান শিকদার কে অনেকেই নিজের রুপের জালে ফাসাতে চাইতো।কিন্তু রাফসান শিকদার কাউকে পাত্তা দিত না।বিয়ের অনেক বছর হয়ে যাওয়ার পরেও তাদের কোন সন্তান হচ্ছিল না।নূরের মা সব সময় ডিপ্রেশনে ভুগতো।অনেক ডাক্তার দেখিয়ে ও যখন কাজ হচ্ছিল না তখন সে রাফসান শিকদার কে আরেকটা বিয়ে করতে বলে। সেদিন রাফসান শিকদারের ভয়ংকর চেহেরা দেখেছিল সবাই।

জীবনে প্রথম বারের মতো প্রিয়তমা স্ত্রীর গায়ে হাত তোলে সে।রাগ করে চলে যায় কানাডায় কামিনী চৌধুরীর কাছে।এখানেই জীবনের সবচেয়ে বড় ভুলটা করে বসে সে।হতাশায় কষ্টে নিজেকে সামলাতে না পেরে নিয়মিত বারে যাওয়া শুরু করে। কামিনী চৌধুরী সব দেখে ও কিছু বলতেন না।উল্টো ভাই কে আরো উস্কে দিতেন বউয়ের বিরুদ্ধে। নিজের কানাডিয়ান বান্ধবী লিন্ডা কে সারাক্ষণ রাফসান শিকদারের আশেপাশে রাখতেন। লিন্ডা সারাদিন চিপকে থাকতো রাফসান শিকদারের সাথে। রাফসান শিকদার বিরক্ত হলেও কিছু বলতো না। কয়েকবার কামিনী চৌধুরীর কাছে নিষেধ করেছিলেন যেন লিন্ডা তার আশেপাশে না আসে। কামিনী চৌধুরী কানে নেন নি সে কথা। অবশেষে রাফসান শিকদার সিদ্ধান্ত নেন সে বিডি তে ফিরে আসবে।নিজের স্ত্রীর থেকে আর দূরে থাকতে পারছেন না তিনি।তখন ই কামিনী চৌধুরী জঘন্য এক পরিকল্পনা করেন।রাতের খাবারের সাথে ড্রাগস আর উত্তেজক মেডিসিন খাইয়ে দেন রাফসান শিকদার কে। আর লিন্ডা কে পাঠিয়ে দেন রাফসান শিকদারের রুমে।ফলাফল যা হওয়ার তাই হলো। অপরের বোধে পাগলপ্রায় রাফসান শিকদার লিন্ডা কে সেই অবস্থায় গলা চেপে ধরলেন।লিন্ডা কে কোন ভাবে বাচিয়ে নিলেও নিজের পরিকল্পনা সফল করতে পারলেন না কামিনী চৌধুরী। আমজাদ চৌধুরী শুধু স্ত্রীর দিকে হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে ছিল।প্রেয়সীর এমন বিনাশিনী রুপ তাকে ক্ষনে ক্ষনে মৃত্যু দিচ্ছিল। কামিনী চৌধুরী ভেবেছিল ভাই কে ফাসিয়ে লিন্ডা কে তার সাথে বিয়ে দিয়ে দিবেন।কিন্তু তা আর সম্ভব হলো না। রাফসান শিকদার হুংকার ছেড়ে কামিনী চৌধুরী কে প্রশ্ন করলেন,

— এই প্রস্টি*টিউট রাতে আমার রুমে ঢুকলো কি করে কামিনী?আমি রুম লক করে ঘুমিয়ে ছিলাম।

রাফসান শিকদার পাগলা ঘোড়ার মতো আক্রমণ করতে চাইছিল লিন্ডার উপর। অবশেষে কোন কুল কিনারা না পেয়ে সমস্ত দোষ লিন্ডার ঘারে দিয়ে দিলেন কামিনী চৌধুরী। ভাই কে আশ্বস্ত করলেন এই কথা আর কেউ জানবে না। রাগে ঘৃণায় জর্জরিত হয়ে রাফসান শিকদার দেশে ফিরে আসেন। আশমিন তখন হোস্টেল থেকে পড়াশোনা করে। ছোট থেকেই সে হোস্টেলে থাকতো। তাই বাড়িতে কি হতো তা সে জানতো না।

দেশে আসার পর নিজের স্ত্রীর দিকে তাকাতে পারতো না রাফসান শিকদার। তবে স্ত্রীর ভালোবাসায় বেশিদিন তাকে দূরে সরিয়ে ও রাখতে পারে নি। এর মধ্যেই খবর আসে লিন্ডা প্রেগন্যান্ট। রাফসান শিকদার এক কোটি টাকা দিয়ে লিন্ডার মুখ বন্ধ করে দেন। লিন্ডার জমজ ছেলে হয়।ডেলিভারির সময় ই লিন্ডা মারা যায়। কামিনী চৌধুরী একটা ছেলে কে নিজের কাছে নিয়ে এলেও আরেকজন কে হসপিটালেই ফেলে আসেন।তার কার্জ হাসিল করার জন্য একজন ই যথেষ্ট। অযথা টাকা খরচ করে দুজন পালার মানেই হয় না।

আমজাদ চৌধুরী তখনও স্ত্রীর ভালোবাসায় চুপ ছিলেন।আরেকটা ছেলে কে সে নিজের অনাথ আশ্রমে পাঠিয়ে দেন।আর সেই ছেলেটাই হচ্ছে অমি।রাফসান শিকদার কে এ সম্পর্কে কিছুই জানানো হয়নি। অমি কিছুটা বড় হতেই আমজাদ চৌধুরী তাকে সমস্ত সত্যি জানিয়ে দেন।নিজের মায়ের উপর রাগ হলেও রাফসান শিকদার কে কখনো ঘৃণা করেনি অমি।তার মনে হয়েছে রাফসান শিকদার যা করেছে তা একেবারে সঠিক।

তিন বছর পরে নূর হলো।তাদের সংসারে সত্যিকারের খুশি এসে ধরা দিল।সব কিছু ভালোই চলছিল। নূরের মায়ের এক্সিডেন্টে মৃত্যু আবার সব কিছু এলোমেলো করে দিলো। প্রথম প্রথম নূর কে হিংসে করলেও পরে নূর কে বুক দিয়ে আগলে রেখেছে অমি।কখনো ভাই হওয়ার দাবি নিয়ে তার সামনে দাঁড়ায় নি।

তবে তার আরেক ভাই ই তার বাবার জান কেড়ে নিয়েছে এ সম্পর্কে বিন্দুমাত্র ধারণা নেই অমির।কিছু কিছু সত্যি শুধু ধ্বংস ডেকে আনে।তাই রাফসান শিকদার আশমিনের কাছে নিজের জীবন কে খোলা বইয়ের মতো উপস্থাপন করেছিলেন। তার এই জঘন্য অতীত আশমিনের কাছে হেফাজতে রেখে বলেছেন নূর যেন কখনো এই সম্পর্কে জানতে না পারে। তাহলে সে আর তার আব্বু কে ভালোবাসবে না। রাফসান শিকদারের মৃ*ত্যুর পরেও আশমিন তার অতীত কারোর সামনে আসতে দেয়নি। নিজের বাবার প্রতি রাগটা এতো দিন কথায় প্রকাশ করলেও এবার সে হাতে কলমে করার জন্য উঠে পরে লেগেছে। আমজাদ চৌধুরীর নীরবতা ই কামিনী চৌধুরী কে এতটা বিনাশীনি বানিয়ে দিয়েছে।যার শাস্তি তাকে পেতে হবে।

আশমিনের অপারেশন সাক্সেসফুল হয়েছে।গুলি হার্টের এক ইঞ্চি উপর দিয়ে বেড়িয়ে গেছে।তাই খুব একটা ক্ষতি হয়নি।তবে অতিরিক্ত ব্লিডিং এর জন্য এখনো জ্ঞান ফিরেনি।কয়েকদিন হসপিটালেই থাকতে হবে। আশমিনকে কেবিনে সিফট করা হলে সানভি আর অমি গিয়ে দেখে আসে তাকে। আশমিনের জ্ঞান ফিরে ছয় ঘন্টা পরে। পিটপিট করে চোখ খুলে চারিদিকে তাকাতেই চোখ পড়ে সোফায় পায়ের উপর পা তুলে বসে ম্যাগাজিন পড়া নূরের দিকে। আশমিনের দিকে না তাকিয়ে ই উঠে আসে নূর। হাতে একটা বুফে নিয়ে আশমিনের দিকে এগিয়ে যায়।আশমিন এখনো এক ধ্যানে তাকিয়ে আছে নূরের দিকে। নূর বাকা হাসলো। বুফে টা আশমিনের বেডের পাশে রেখে মোহনীয় গলায় বলল,

— মৃত্যুর যাত্রা কেমন ছিল মন্ত্রী সাহেব?

আশমিন ক্রুর হাসলো। সন্তপর্ণে সার্জিক্যাল নাইফ হাতে তুলে নিলো।নুর বেডে এক হাত ভর দিয়ে আশমিনের দিকে ঝুকে আছে।আশমিন নূরের ভর দেয়া হাতের রগ বরাবর এক টান দিয়ে বাকা হেসে বললো,

— সেটা নাহয় একটু উপভোগ করে আসো সোনা।আমি এখানেই ওয়েট করছি তোমার জন্য। হ্যাপি জার্নি।

নূরের হাত থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে।নূর হতভম্ব চোখে তাকিয়ে আছে আশমিনের দিকে। আশমিন ভ্রু কুচকে ফেললো। মুচকি হেসে বললো,

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

আমার জীবন বিডিতে নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন, প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url