ইট পাটকেল পর্ব ১১ - ইট পাটকেল সকল পর্বের লিংক

সকাল থেকেই কামিনী চৌধুরী কে খুব খুশি খুশি লাগছে।নূর তীক্ষ্ণ চোখে সবকিছু অবলোকন করেছে।মায়া বেগম নিজের মতো কাজ করে যাচ্ছেন। বিয়ের পর থেকে কিচেন সে সামলায়।এখন আর সেফের রান্না না খেয়ে সবাই তার হাতের রান্না ই খায়।তবে কামিনী চৌধুরীর খাবার সেফ রান্না করে।
ইট পাটকেল পর্ব ১১ - ইট পাটকেল গল্পের লিংক
আশমিন আজ সপ্তাহ খানেক হলো কানাডা গিয়েছে।কিছু জরুরি কাজে আটকে যাওয়ায় আরো কয়েকদিন থাকতে হবে। নূরের সাথে এই কয়েকদিন কথা হয়নি তার। কামিনী চৌধুরী নূর কে চার’শ কোটি টাকা ফিরিয়ে দিয়েছে কাল।সেই সাথে আর এস কোম্পানির থেকে শেয়ারের একটা পোশাক কারখানা তাকে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে।পৈতৃক সুত্রে সে এই কারখানা পেয়েছে।আর এস কোম্পানি তে তার আর কোন শেয়ার নেই।কামিনী চৌধুরী দাতে দাত চেপে মেনে নিয়েছে সব।কোথায় চার হাজার কোটি টাকার ইন্টারন্যাশনাল কোম্পানি আর কোথায় পঞ্চাশ কোটি টাকার সামান্য একটা কারখানা।

আরো পড়ুন : ইট পাটকেল পর্ব ১
ইট পাটকেল পর্ব ২
ইট পাটকেল পর্ব ৩
ইট পাটকেল পর্ব ৪
ইট পাটকেল পর্ব ৫
ইট পাটকেল পর্ব ৬
ইট পাটকেল পর্ব ৭
ইট পাটকেল পর্ব ৮
ইট পাটকেল পর্ব ৯
ইট পাটকেল পর্ব ১০
ইট পাটকেল পর্ব ১১
ইট পাটকেল পর্ব ১২
ইট পাটকেল পর্ব ১৩
ইট পাটকেল পর্ব ১৪
ইট পাটকেল পর্ব ১৫
ইট পাটকেল পর্ব ১৬
ইট পাটকেল পর্ব ১৭
ইট পাটকেল পর্ব ১৮
ইট পাটকেল পর্ব ১৯
ইট পাটকেল পর্ব ২০
ইট পাটকেল পর্ব ২১
ইট পাটকেল পর্ব ২২
ইট পাটকেল পর্ব ২৩
ইট পাটকেল শেষপর্ব ২৪


আজ ছুটির দিন। শুক্রবার কেউ অফিসে যায় না।আমজাদ চৌধুরী নিজের রুমে রেস্ট নিচ্ছে।মায়া বেগমের রুমেই সে থাকে।কয়েকবার কামিনী চৌধুরীর কাছে যেতে চাইলেও কামিনী চৌধুরী তাকে রুমে ঢুকতে দেয়নি। মায়া বেগমের সাথে তার সম্পর্ক আগের মতোই আছে। কেউ কারোর সাথে খুব একটা কথা বলে না। আশমিনের সাথেও দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে আমজাদ চৌধুরীর। চার বছর বয়স থেকে আশমিন হোস্টেলে থেকে পড়াশোনা করেছে।কামিনী চৌধুরী ছোট বেলা থেকেই আশমিনের প্রতি ছিল উদাসীন। জীবনের বিশ টা বছর সে হোস্টেলেই কাটিয়েছে।তবুও আমজাদ চৌধুরীর সাথে তার সম্পর্ক ছিল বন্ধুর মতো। আজ এতো কাছে থেকেও তাদের মধ্যে হাজার মাইলের দূরত্ব।

ড্রয়িং রুমে বসে অফিসের কিছু কাজ করছিল নূর।অমি কিছু হিসেব বুঝিয়ে দিচ্ছে তাকে।আজ আশমিনের দেশে আসার কথা। সেদিন ই একইরকম দেখতে আরেকটা গাড়ি নিয়ে এসেছে আশমিন।

কলিং বেলের শব্দে কামিনী চৌধুরী একপ্রকার দৌড়ে গিয়ে দরজা খুললেন।মেড গুলো হা করে তাকিয়ে আছে কামিনী চৌধুরীর দিকে। দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ টা কে দেখে কামিনী চৌধুরীর মুখ চকচক করে উঠলো। তাকে জরিয়ে ধরে কুমিরের কান্না কাদতে লাগলো। নূর চোখ মুখ কুচকে সেদিকে তাকিয়ে আছে। ছেলেটার চেহারা দেখা যাচ্ছে না। অমি নিস্প্রাণ চোখে তাকিয়ে রইলো কামিন চৌধুরীর দিকে। কামিনী চৌধুরীর কান্নার আওয়াজ শুনে আমজাদ চৌধুরী ও বেরিয়ে এসেছে তার রুম থেকে। কামিনী চৌধুরী কে শান্ত করে বুক থেকে সরাতেই কেপে উঠলো অমি।অপলক চোখে তাকিয়ে রইলো সেদিকে।এ জেন তারই প্রতিচ্ছবি। নূর একবার দেখে আবার নিজের কাজে মন দিলো। সেদিকে চোরা চোখে তাকালো অমি।নুরের কোন প্রতিক্রিয়া না দেখে অবাক হলেও কিছু বললো না। আমজাদ চৌধুরী একবার নূরের তাকিয়ে আবার শক্ত চোখে কামিনী চৌধুরীর দিকে তাকালো। মনে মনে করুণা হলো তার সহধর্মিণীর জন্য। পদে পদে হেরে নিজেকে উন্মাদ করে চলেছে।এর পরিনতি অত্যন্ত ভয়ংকর।

ছেলেটা কে নিয়ে ভিতরে আসলো কামিনী চৌধুরী। ছেলেটা দেখতে অমির মত হলেও অমি থেকে তার গায়ের রঙ অনেকটা উজ্জ্বল।

কামিনী চৌধুরী শয়তানি হেসে নূরের বরাবর এসে বসলো। সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললো,

— সবার মনে অনেক প্রশ্ন তা আমি জানি।তার আগে পরিচয় করিয়ে দেই,এ হচ্ছে আশিয়ান শিকদার।শিকদার আম্পায়ারের একমাত্র উত্তরাধিকারী।রাফসান শিকদারের ছেলে।

আশিয়ান এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে অমির দিকে।দেখতে তার মতো ছেলেটা কে বুঝতে বাকি নেই তার।কাউকে কিছু না বলে সে অমি কে শক্ত করে জরিয়ে ধরলো। অমি অবাক হলেও কিছু বললো না। কামিনী চৌধুরী মুখ কুচকে সেদিকে তাকিয়ে আছে। নূর এবার আয়েশ করে বসলো।

অমি নিজেকে ছাড়িয়ে নিলো আশিয়ানের থেকে।চোখের পানি লুকিয়ে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।

প্রায় বিশজন গার্ডসহ বাড়িতে ঢুকলো আশমিন। সারি সারি লাগেজ গুলো রেখে গার্ড গুলো নিজেদের জায়গায় দাঁড়িয়ে পড়লো। আশমিন ক্লান্ত গা এলিয়ে দিলো সোফায়।নূরের কাধে মাথা রেখে ন্যাকা গলায় বলল,

— আই মিসড ইউ বউ। তোমাকে ছাড়া থাকতেই পারছলাম না জানো?তাই তারাতাড়ি চলে এলাম।

নূর ক্লান্ত শ্বাস ছাড়লো। না এই লোকের অসহ্য কারবার শেষ হবে আর না নূর ভালো বউদের মতো সংসার করতে পারবে। আশমিন কে কিছু না বলে আশিয়ানের দিকে তাকালো নূর। সে আপাতত কামিনী চৌধুরীর পাশে বসে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে আছে নূর আর আশমিনের দিকে। নূর সেদিকে পাত্তা না দিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,

— আপনার পরিচয়?

কামিনী চৌধুরী কর্কশ গলায় বলল,

— এই মেয়ে,একটু আগে কি বললাম শুনতে পাওনি?

— নাহ।আমি সবার কথায় কান দেই না।রাস্তার কুকুর ও ঘেউঘেউ করে।তাই বলে তা মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে তার কোন মানে নেই।আমি আপনার সাথে কথা বলছি না মিসেস চৌধুরী।পরের বার আমার কথায় বাম হাত ঢুকানোর চেষ্টা করবেন না। আই ডোন্ট লাইক ইট।

কামিনী চৌধুরী কটমট করে তাকালো নূরের দিকে। আশিয়ান ইশারায় তাকে শান্ত হতে বলে নূরের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললো,

— আমি আশিয়ান শিকদার। রাফসান শিকদারের ছেলে।

আশমিন নূরের কাধ থেকে মাথা তুলে সোজা হয়ে বসলো। তীক্ষ্ণ চোখে তাকালো আশিয়ানের দিকে।

নূর শান্ত চোখে তাকালো। উঠে গিয়ে রাফসান শিকদারের কাউচে বসে পায়ের উপর পা তুলে গম্ভীর গলায় বলল,

— প্রুফ?

আশিয়ান নড়েচড়ে বসলো।জোর গলায় বলল,

— ডিএনএ টেস্ট করিয়ে দেখতে পারো। কানাডায় আমার আম্মুর সাথে সম্পর্ক ছিল তোমার বাবার। সেখানেই আমার জন্ম। আমজাদ চৌধুরীর আর মামনি সাক্ষী আছেন।চাইলে জিজ্ঞেস করতে পারো নূর।

নূর ক্রুর হাসলো। আশমিন শান্ত চোখে তাকিয়ে আছে নূরের দিকে। নূর মলিন চোখে তাকালো আশমিনের দিকে। আশমিন চোখ সরিয়ে নিলো। এ তো একদিন হওয়ার ই ছিল। নূর আশিয়ানের দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের গলায় বলল,

— আমার বাবার এক রাতেই বেড পার্টনার ছিল আপনার মা।তার জন্য তাকে এক কোটি টাকা পেমেন্ট করা হয়েছে। আর আপনার মা আমার বাবার সুযোগ নিয়েছিল। তার বেহায়াপনার ফল হচ্ছেন আপনি। যাকে বলে অবৈধ সন্তান। কোন অবৈধ সন্তান কি করে রাফসান শিকদারের উত্তরাধিকারী হতে পারে? নিজের অবস্থান বুঝতে শিখুন মি. আশিয়ান।লোকে শুনলে হাসবে যে।

আশিয়ান চোয়াল শক্ত করে তাকিয়ে আছে নূরের দিকে। এই মেয়ে কে দুই আঙ্গুলে পিষে দেলা তার দুই মিনিটের ব্যপার। নিজের হিংস্রতা এই মুহুর্তে বাইরে আনতে চাইছেনা সে।কামিনী চৌধুরী বাকা হাসলো। সে জানতো নূর এমন কিছুই করবে।আশিয়ান কে হালকা ভাবে নেয়া তাদের মোটেই উচিত হচ্ছে না। ডুবাইয়ের নামকরা মাফিয়া সে। শিকদারের এই অর্থ সম্পদ তার হাতের ধুলোর মতো। কিন্তু সে শিকদার দের মৃ*ত্যু চায়।তার মায়ের মৃ*ত্যুর বদলা নেয়ার জন্যই তার এখানে আসা।চাইলে এই মুহুর্তে সবাই কে মেরে ফেলতে পারে সে। কিন্তু এতো সহজ মৃত্যু এদের দিবেনা আশিয়ান।ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর যন্ত্রণা দিবে এদের।তার কাছে মৃত্যু খুব সামান্য শাস্তি।

— সত্যি টা জানানোর ছিল তাই জানালাম। অনেক তো আয়েশ করলে।এবার নাহয় বাবার জারজ সন্তানের সাথে হালকা মোকাবেলা হয়ে যাক।



আশমিন শব্দ করে হেসে উঠলো। আশিয়ান আর কামিনী চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে ক্রুর হেসে বললো,

— কেন নয় মি.মাফিয়া।আপনার অপেক্ষায় আমার চোখের নিচে কালি পরে গেলো। এতো অপেক্ষা তো আমি আমার বউয়ের জন্য ও করিনি। এসেছেন, কয়েকদিন ঘুরুন ফিরুন। যা হওয়ার তা নাহয় পরে হবে। দেখা গেলো আর সুযোগ ই পেলেন না বাংলাদেশ দেখার।কয়েকদিন রেস্ট নিন।এখন আপনি আসতে পারেন।আমার খুব প্রেম পেয়েছে।এই মুহুর্তে বউ দরকার। আমি আবার প্রেম চেপে রাখতে পারি না। আসো তো বউ।

কাউকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে নূর কে টেনে উপরে নিয়ে গেলো আশমিন। অমি কোন দিকে না তাকিয়ে সোজা বেরিয়ে গেল বাসা থেকে। আশিয়ান আয়েসি ভঙ্গিতে বসে বাকা হাসলো। ইন্টারেস্টিং কিছু হবে এবার।

আশমিন নূর কে নিজের রুমে এনেই দরজা বন্ধ করে দিল।নূর শয়তানি হেসে তাকিয়ে আছে আশমিনের দিকে। আশমিন কিছু বলতে যাবে তার আগেই নূর অগ্রাসী ভাবে আদর করতে লাগলো আশমিন কে। আশমিন থমকে গেলো। মাথার মধ্যে সবকিছু তালগোল পাকিয়ে গেলো।ঠোঁটে হালকা ব্যথার আবির্ভাব হতেই দুই লাফে দূরে সরে গেলো।

— তুমি এভাবে একজন গণ্যমান্য মন্ত্রীর ইজ্জত লুটে নিতে পারো না! আমার এতো বড় সর্বনাশ করো না নূর। আমি জনগণের কাছে মুখ দেখাতে পারবো না। এখনো বউয়ের সাথে বাসর টা ও করা হয়নি।

নূর কটমট চোখে তাকালো আশমিনের দিকে। আশমিন দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে দাঁড়িয়ে আছে। নূর একটা বালিশ ছুড়ে মারলো আশমিনের দিকে। রাগী গলায় বলল,,

— এমন করলে আর বাসর করাও হবে না। এতো নাটক করেন কিভাবে?অসহ্য মানুষ একটা।

কনফারেন্স রুমে মুখোমুখি বসে আছে আশমিন আর নূর।তার পাশেই আমজাদ চৌধুরী অমি আর সানভি বসে আছে। সবার মুখে চিন্তার ছাপ থাকলেও নূর স্বাভাবিক ভাবে কিছু একটা ভেবে যাচ্ছে।আজ সকাল থেকেই শেয়ারবাজারে তাদের শেয়ারের রেট কমছে।এভাবে চলতে থাকলে কোম্পানি অনেক বড় লসের মুখে পড়বে। বড় বড় কোম্পানি গুলো তাদের প্রোডাক্ট কম দামে ছেড়ে দিচ্ছে। সবার কোম্পানি তেই ইনভেস্ট করেছে আর এস কোম্পানি।তাই আজ সবাইকে মিটিং এ ডেকেছে নূর। চৌধুরী গ্রুপ অব ইনডাস্ট্রিজের এম ডি হিসেবে আশমিন আর আমজাদ চৌধুরী এখানে উপস্থিত হয়েছে। আশমিন একটু পর পর হাই তুলছে। আজ একটা সমাবেশ আছে তার। এভাবে বসে থেকে সময় নষ্ট করার সময় নেই তার।বিরোধী দল আজ একটা ঝামেলা পাকাবেই।সেভাবেই প্রস্তুতি নিয়ে যাচ্ছে সে। নিজের হিংস্রতা যতটা সম্ভব লুকিয়ে রাখে সে। আবার এক বেওয়ারিশ বাদর ছানা এসে জুটেছে।নাহ! আর ভালো হওয়া হলো না। আফসোসের শিষ তুললো আশমিন।আমজাদ চৌধুরী প্রচুর ক্ষেপে আছে কামিনী চৌধুরীর উপর। ভালোবাসায় অন্ধ হয়ে আজ এই দিন ডেকে এনেছে সে।প্রথম দফায় লাগাম টেনে ধরলে বুড়ো বয়সে এসব দেখতে হতো না।

আশমিন সপ্তম বারের মতো হাই তুলে জোরে বললো,

— আস্তাগফিরুল্লাহ।

আমজাদ চৌধুরী ভ্রু কুচকে তাকালো ছেলের দিকে। আশমিন সরল হেসে বললো,

— নতুন বর যে!কি খবর আপনার?দিনকাল কেমন চলে?

আমজাদ চৌধুরী বিরক্ত হয়ে চোখ সরিয়ে নিলেন। নূর অমি কে কিছু কাজ বুঝিয়ে দিয়ে নিজের কেবিনে দেখা করতে বললো।অমি মুচিকি হেসে সায় জানিয়ে চলে গেলো।

হঠাৎ আশমিন গম্ভীর গলায় নূর কে ডাকলো,, নূর।

— কি হয়েছে?(ভ্রু কুচকে)

— তুমি আশিয়ানের কথা আগে থেকেই জানতে?(শীতল গলায়)

আশমিনের প্রশ্নে তপ্ত শ্বাস ছাড়লো নূর।ভরাট গলায় বলল,

— নাহ।কিছুদিন আগে জেনেছি।

— মামা কে ভুল বুঝো না নূর।আমরা সবাই পরিস্থিতির স্বিকার।

চোয়াল শক্ত হয়ে গেলো নূরের।শক্ত গলায় বলল,

— নাহ মন্ত্রী সাহেব। আমরা আপনার মায়ের লোভের স্বীকার,আপনার মায়ের হিংসার স্বীকার, আপনার মায়ের জেদের স্বীকার। আপনার মায়ের পাপ কে পরিস্থিতির উপর চাপিয়ে দিবেন না।

আশমিনের চোখ ঘোলাটে হলো। মলিন গলায় বলল,

— আমাকে ঘৃণা করো নূর?

নূর থমকালো। উত্তর না দিয়ে শান্ত দৃষ্টিতে তাকালো আশমিনের দিকে। আশমিন মলিন হাসলো। চোখ বন্ধ করে আমজাদ চৌধুরী কে উদ্দেশ্য করে বললো,

— আমি মিসেস চৌধুরী কে কিভাবে ক্ষমা করবো আব্বু?সে যে আমার মমতাময়ী মায়ের খু*নি।তার মধ্যে বাস করা আমার আম্মুকে সে মেরে ফেলেছে। সে এখন শুধু কামিনী চৌধুরী। তার আর কোন পরিচয় নেই।

বিশাল কনফারেন্স রুমে তিনজন মানুষের নিরবতা তাদের হারানোর বিশালতা জানিয়ে দিচ্ছে।

— এতো কিছুর পরেও তুমি তাকে কিভাবে এতো ভালবাসো আব্বু?

আমজাদ চৌধুরী হাসলো। ছেলের দিকে তাকিয়ে ক্লান্ত গলায় বলল,

— তোমরা তার বিনাশিনী রুপ কেই চেনো। আর আমি তাকে নিজের একমাত্র কাছের মানুষ হিসেবে চিনি।যে বিদেশের মাটিতে আমার একমাত্র আশ্রয় ছিল। আমার কান্নায় যে কাদতো,আমার হাসি তে যে হাসতো, আমার উদাসীনতায় যে বিষন্ন হয়ে যেত।আমার খারাপ সময়ে এক মিনিটের জন্য যে আমার হাত ছাড়েনি তার প্রতিশোধের আগুনে উন্মাদ হওয়ায় আমি কিভাবে তার হাত ছেড়ে দিতাম বলো? প্রত্যেকটি ঘটনার দুটো দিক আছে বাবা।কারণ ছাড়া এই পৃথিবীতে কিছুই ঘটে না।তোমার মা তার জায়গায় ঠিক। আবার তোমরা তোমাদের জায়গায় সঠিক। তবে যা ঘটছে তা ঠিক নয়। আমি শুধু তোমাকে একটা কথাই বলতে পারি বাবা,তোমার আম্মু যতো অন্যায় ই করুক না কেন আমি তাকে ভালবাসি।আমার এই ছোট্ট জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবাসি। সে আমার বেচে থাকার অনুপ্রেরণা। যাকে দেখে আমার আরো একটা জীবন বেচে থাকতে ইচ্ছে করে। আমার এই জীবন আমার নয়।তাকে ভালবেসে নিজের ভিতর নিজেকে অনুভব করতে পারিনা আমি।আমার পুরোটা জুরেই শুধু সে।তোমরা ছাড়া আমার আর কে আছে বলো? তুমি হয়তো ভাবছো আমি কেন তোমার মা কে সঠিক পথে নিয়ে এলাম না।তাহলে শুনে রাখো বাবা,তোমার মা বেচে আছে এই প্রতিশোধের তাগিদে। রাফসান ভাই তার নিজের কর্মফল ভোগ করেছে। ভাবি ও বাদ যায়নি।কামিনী ও করবে। আমি ও করছি।একটা কথা জেনে রাখো বাবা, একসময়ের আঘাত গুলো ই কামিনী এখন ফিরিয়ে দিচ্ছে।

— সে সুস্থ নয় আব্বু।

— আমি জানি(হালকা হেসে)।সামনে ঝড় আসছে।সামলে নিতে পারবে আমি জানি। যাকে ভালোবাসবে তাকে শত চেষ্টার পরেও ঘৃণা করতে পারবে না।হোক সে উন্মাদ, পাগল,ভয়ংকর অপরাধী। আর এখানেই আমার ব্যর্থতা। অতীত খুজতে যেয়ো না বাবা।অতীত খুজতে গেলে আমাকে হারাবে।

আমজাদ চৌধুরী নিঃশব্দে চলে গেলেন।নূর আমজাদ চৌধুরীর কোন কথা ই বুঝতে পারেনি। কি এমন করেছিল তার বাবা যার জন্য কামিনী চৌধুরী আজ এভাবে হিংস্র হয়ে উঠেছে? আশমিন চোখ বন্ধ করে গা এলিয়ে বসে আছে। এতো ক্ষমতা, এতো টাকা, আভিজাত্য দিয়ে কি হবে? যেখানে দম বন্ধ হয়ে আসে।চারিদিকে শুধু কষ্টের হাতছানি।

সানভি নক করে বললো,

— সবাই চলে এসেছে ম্যাম।

— ভিতরে পাঠিয়ে দাও।

— ওকে।

সানভি চলে যেতেই সোজা হয়ে বসলো আশমিন।নূর পেপার গুলো চেক করে আশমিনের দিকে এগিয়ে দিলো।

— অফিসের মধ্যে কি শুরু করলে।এখানে ও লাভ লেটার দিতে হবে? তোমাকে নিয়ে আর পারি না,কেন যে এতো ভালোবাসো আমাকে!

— হয়ে গেছে? (দাতে দাত চেপে)

আশমিন হতাশার শ্বাস ফেলে বললো,

— হলো আর কই?তুমি তো সুযোগ ই দিলে না।এরকম একটা বউ রেখে আমি শুকিয়ে মরছি।দেখো, এই মাত্র দুই গ্রাম শুকিয়ে গেলাম।আল্লাহ কে ভয় করো নূর। এমন জনদরদি মন্ত্রী কে তুমি বউ শূন্যতায় শুকিয়ে মারছো।আল্লাহ সহ্য করবে না। এখনো সময় আছে।পাশের রুমে চলো।বাসর দিনটা সেরে ফেলি।

নূর চিৎকার করে বললো,

— চুপ করুন অসভ্য লোক।আপনার মুখে আমি পিন মেরে দিবো। সারাক্ষণ আজেবাজে কথা। আরেকটা কথা বললে বেইলি রোডে দাড় করিয়ে আখের রস বিক্রি করাবো।তখন মন ভরে জনসেবা করবেন আর নিজেকে ও ভিজিয়ে রাখবেন।অশ্লীল।

নূরের রক্তিম ফেস দেখে আশমিন আর কিছু বললো না। তারাতাড়ি ফাইল দেখায় মনোযোগ দিল।

— আপনাদের এখানে ডাকার কারণ আপনারা সবাই জানেন। নিয়ম অনুযায়ী আপনারা আমাদের সাথে করা চুক্তি ভঙ্গ করেছেন।আমাদের কোম্পানি কে ইনফর্ম না করে নিজেদের প্রোডাক্ট নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অর্ধেক দামে ছেড়ে দিয়েছেন। কন্ট্রাক্ট পেপারে উল্লেখ আছে যে,কোন বড় ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়ার হলে সবার মতামত নিয়ে নিতে হবে। চেয়ারম্যান যা সিদ্ধান্ত নিবে তা ই চুড়ান্ত হিসেবে গণ্য হবে। আপনাদের কোম্পানি আমার কোম্পানির আন্ডারে আছে।আমাকে না জানিয়ে প্রোডাক্ট লঞ্জ করে দিয়েছেন।তাই আজ থেকে আপনার আর এস কোম্পানি থেকে কোন কাচামাল পাবেন না। আমদের কোম্পানি থেকে আপনাদের আলাদা করে দেয়া হলো।আগামী দশ দিনের মধ্যে আমাদের সমস্ত ইনভেস্টমেন্ট ব্যাক করবেন।না হলে আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে এবং আপনাদের কোম্পানি সিল করে দেয়া হবে।

সবার কপালে সুক্ষ্ম ঘামের রেখা দেখা দিয়েছে। নূরের তেজী মুখের দিকে তাকিয়ে কথা বলার সাহস হচ্ছে না কারোর।

অমি সবার হাতে একটা করে নোটিশ ধরিয়ে দিলো। এতগুলো টাকা একসাথে ফিরিয়ে দেয়া কোন ভাবেই সম্ভব না। আশিয়ানের হুমকি তে পরেই তারা প্রোডাক্ট কম দামে বাজারজাত করেছে।প্রথমেই এতো লস।এখন এতো টাকা!

— ম্যাডাম আমরা জানে মারা যাবো। একটু দয়া করুন।আমরা নিরুপায় হয়ে এই কাজটা করে ফেলেছি।

লোকটা সব কিছু খুলে বললো নূর কে।

— আপনাদের আমাদের সাথে আলোচনা করা উচিত ছিল।

— ফ্যামিলির উপর রিস্ক হয়ে যেতো ম্যাডাম।আপনার বাবার সাথে থেকে আমরা বিজনেস করছি।কখনো এমন হয় নি।

আশমিন গম্ভীর গলায় বলল,

— যা হওয়ার হয়ে গেছে। প্রোডাকশন কয়েকদিন বন্ধ রাখুন।কয়েকদিন পরে নতুন করে আগের দামে মাল বাজারজাত করবেন। আপনাদের লস পুষিয়ে দেয়া হবে।

সবাই সন্তুষ্ট হলেও নূর হতে পারলো না। তবুও চুপ করে সম্মতি দিল।আশমিন নূরের মনোভাব বুঝতে পারলো। সবাই বেরিয়ে যেতেই শান্ত গলায় বললো,

— আমাদের ব্যক্তিগত শত্রুতার জন্য তারা কেন ভুগবে নূর?সব কিছুর দায় আমাদের। মাথা ঠান্ডা রাখো। কিছুতেই মাথা গরম করবে না।এমন কি আমি এই মুহুর্তে তোমাকে চুমু খেলেও না।

কথা,শেষ করেই নূরের অধরে অধর মিলিয়ে দিয়েছে আশমিন। হাত পা ছোড়াছুড়ি করেও যখন কাজ হলো না তখন শান্ত হয়ে গেলো নূর।নিজেও হালকা জরিয়ে ধরলো আশমিন কে। নূরের আলিঙ্গনে উন্মাদ হয়ে গেলো আশমিন। এক হাতে সুইচ টিপে সমস্ত রুমের ইলিক্ট্রেসিটি বন্ধ করে দিলো। কোমড় টেনে নূর কে নিজের সাথে চেপে ধরে কোলে বসিয়ে দিল।

বিশ মিনিট পর দরজায় নক করলো সানভি।ততক্ষণে সবকিছু অনেকটা হাতের বাইরে চলে গেছে। ঘনঘন শ্বাস টেনে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করলো আশমিন। নূরের অবস্থা নাজেহাল। পরিপাটি করা চুলগুলো এলোমেলো হয়ে মুখের সামনে পরে আছে।আশমিনের শুভ্র পাঞ্জাবি ফ্লোরে লুটপুটি খাচ্ছে। নূর কে কোলে তুলে পাশের বিশ্রামের জন্য বরাদ্দকৃত রুমের দিকে অগ্রসর হলো আশমিন। বেডে শুয়িয়ে দিয়ে এলোমেলো চুল গুলো হাত দিয়ে ঠিক করে দিলো। পোশাক ঠিক করে দিয়ে নেশালো গলায় বলল,

— যেতে হবে বউ। আজ রাত টা আমাদের হবে।আর কোন দূরত্ব চাই না আমি। আই নিড ইউ ব্যাডলি।

নূর চোখ বন্ধ করে আছে। আশমিন নূরের ঠোঁটে হালকা চুমু খেয়ে বললো,

— এখানে কিছুক্ষণ থাকো।আমি আসছি।রাতে দেখা হবে।অপেক্ষা করবে তো আমার জন্য?

নূর জরিয়ে ধরলো আশমিন কে। ধীর গলায় বলল,

— করবো।

হালকা হেসে বেরিয়ে গেল আশমিন। পাঞ্জাবি গায়ে দিয়ে নিজেকে পরিপাটি করে বেরুলো রুম থেকে। সানভি মুখ লটকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আশমিন সেদিকে পাত্তা না দিয়ে সরাসরি সিসিটিভি কন্ট্রোল রুমে চলে গেলো। কিছু ফুটেজ ডিলিট করে গটগট করে বেড়িয়ে গেলো অফিস থেকে। সানভি দৌড়ে এলো আশমিনের পিছু।

— আজকে সারা রাত তুমি সুইমিংপুলে দাঁড়িয়ে থাকবে সান।এটা তোমার শাস্তি।

সানভি অবাক হয়ে গেলো। ভয়ার্ত গলায় বলল,

— আমি কি করেছি স্যার।

আশমিন কটমট করে তাকালো সানভির দিকে। দাতে দাত চেপে বললো,

— আমার ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে পৃথিবীতে আসতে বাধা দিয়েছো।এতো বড় সাহস তোমার! নাহ!সুইমিংপুলে না তুমি হাতিরঝিলের নর্দমায় দাড়িয়ে থাকবে সারা রাত।আমি নিজে পাহারা দিবো তোমায়।

সানভির মুখটা কাদো কাদো হয়ে গেলো। সে বুঝতেই পারছে না সে কি ভুল করে বসেছে।

এই পোস্টটি পরিচিতদের সাথে শেয়ার করুন

পূর্বের পোস্ট দেখুন পরবর্তী পোস্ট দেখুন
এই পোস্টে এখনো কেউ মন্তব্য করে নি
মন্তব্য করতে এখানে ক্লিক করুন

আমার জীবন বিডিতে নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন, প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।

comment url